
উদ্ধার হওয়া ব্যবসায়ীর নাম মো. হেলাল উদ্দিন (৩৬)। তিনি হাটহাজারীর বাসিন্দা এবং পাঁচলাইশের শুলকবহর রওশন বোর্ডিং-সংলগ্ন এলাকায় একটি গাড়ির গ্যারেজ পরিচালনা করেন।
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছেন মামলার এজাহারনামীয় আসামি মো. আবুল হাশেম (৫২)। অন্যরা হলেন আকরাম (৩৪), শান্ত মিয়া (৩২), মঈন উদ্দিন রায়হান (২৯), আমজাদ হোসেন (৩৫), মাহবুব রহমান (২৬), মানিক হোসেন (৩০) ও মো. ফারুক (৩৪)।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হেলাল উদ্দিনের পূর্বপরিচিত ও ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন আবুল হাশেম। ব্যবসায় তিনি হেলালের কাছে ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে হেলাল ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। অবশিষ্ট ৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
অভিযোগ রয়েছে, পাওনা টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আবুল হাশেম বেশ কিছুদিন ধরে হেলালকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে আবুল হাশেমসহ কয়েকজন শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের সামনে যান। সেখানে ভয়ভীতি দেখিয়ে হেলালকে জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর সকালে হেলালের মোবাইল ফোন থেকে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারের নম্বরে ফোন করা হয়। ফোনে অপহরণকারীরা ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না দিলে হেলালকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করে এক লাখ টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়। ঘটনার পর জেসমিন আক্তার পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা করেন।
দণ্ডবিধির ৩৬৫, ৩৮৫, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় দায়ের করা মামলাটি তদন্তে নামে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, মামলার পর তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অপহরণকারীদের গতিবিধি শনাক্তের চেষ্টা শুরু হয়। একপর্যায়ে ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আকবরশাহ থানার উত্তর কাট্টলী এলাকা থেকে শান্ত মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচলাইশের মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আবুল হাশেমকে। পরে আবুল হাশেমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আকবরশাহ থানার লতিফপুর এলাকা থেকে আকরামকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় হেলাল উদ্দিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শান্ত ও আকরাম হেলালকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে সে বিষয়ে তথ্য দেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, হেলালকে মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জের মহামায়া লেক এলাকায় রাখা হয়েছে।
এরপর মীরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের সহায়তায় মহামায়া লেকের ভেতরে বন বিভাগের একটি পরিত্যক্ত কটেজে অভিযান চালানো হয়। সেখানে গিয়ে পুলিশ হেলাল উদ্দিনকে উদ্ধার করে।
একই অভিযানে মঈন উদ্দিন রায়হান, আমজাদ হোসেন, মাহবুব রহমান, মানিক হোসেন ও ফারুককে গ্রেপ্তার করা হয়
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা ব্যবসায়িক পাওনা টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে হেলালকে অপহরণের কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে পাওনা ছিল যেখানে ৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা, সেখানে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করার বিষয়টি তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের দাবি, আবুল হাশেম ও আকরাম মিলে শান্ত মিয়াকে এক লাখ টাকা দিয়ে অন্যদের ভাড়া করে অপহরণে সম্পৃক্ত করেন।
অর্থাৎ পাওনা টাকা আদায়ের বিরোধকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবেই একটি অপহরণচক্র তৈরি করে হেলালকে তুলে নেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে দ্রুত অভিযান চালিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় জড়িতদের আটক করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ব্যক্তি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের এই অভিযানে একদিকে যেমন অপহৃত ব্যবসায়ীর জীবন রক্ষা পেয়েছে, অন্যদিকে মাত্র কয়েক লাখ টাকার ব্যবসায়িক বিরোধ কীভাবে পরিকল্পিত অপহরণ ও বড় অঙ্কের মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় রূপ নিয়েছিল, তারও একটি চিত্র সামনে এসেছে।