বাগেরহাটের পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া অভিযোগ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও ক্লিপ থেকে জানা যায়, কলেজছাত্র ও সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া সোর্স মো. শফিকুল ইসলাম মুসা শীর্ষ মাদক কারবারি ইলিয়াসকে দেখতে পেয়ে তিনিই পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন।
কিন্তু অভিযানের পর ওসি রোকেয়া খানম তার কাছে ১০০ পিস ইয়াবা দাবি করেন। এতে রাজি না হওয়ায় ওসির বডিগার্ড নাহিদ হাসান সুমনের মাধ্যমে ৫০ পিস ইয়াবা থানার গেটের সামনে রেখে যেতে বলা হয়।
এ অডিও ক্লিপটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর নানা আলোচনা সমালোচনার তৈরি হয়েছে। এবিষয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মূল ঘটনা জানিয়েছেন ওসি রোকেয়া খানম।
তিনি বলেন, গত ২ আগস্ট আমরা মাদক কারবারি ইলিয়াসকে গ্রেফতার করি। সে একজন সন্ত্রাসী এবং বিশাল মাপের মাদক ব্যবসায়ী। তাকে গ্রেফতার করার পর তার স্টেটমেন্ট অনুযায়ী জানতে পারি যে, মুসা যে নিজেকে সাংবাদিক দাবি করতেছে সে কোন পত্রিকার সাংবাদিক আমার জানা নেই। এই মুসা নিজেকে সাংবাদিক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করে অর্থ আদায় করে এবং মাদক কারবারিদের সঙ্গে জড়িত।
ওসি বলেন, আমরা মাদক ব্যবসায়ী ইলিয়াসকে গ্রেফতারের পর তার স্টেটমেন্ট অনুযায়ী জানতে পারি যে, এই মুসা সাংবাদিক এবং প্রশাসনের লোক দাবি করে ইলিয়াসের থেকে মাসিক একটা চাঁদা নেয়। প্রশাসনের কথা বলে সে মাসিক ৬০ হাজার টাকা নেয়। ইলিয়াসের মাদক আনা নেওয়া করে মুসা। এটা যখন জানতে পারি, তখন আমি মুসাকে কয়েকবার মুঠোফোনে কল করি। তাকে বলি তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে, তুমি থানায় আসো। সে আসে না।’
তিনি বলেন, তারপর আমি আরও খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে, যত মাদক ব্যবসায়ী আছে তাদেরকে আশ্রয় দিয়ে আসছে মুসা এবং বলে যে, প্রশাসনিক বিষয় আমি দেখব, প্রশাসন আমার হাতে, কোনো চিন্তা নেই কোনো প্রশাসন আপনাদের ধরবে না। এ কথা বলে সে এর কাছে ওর কাছে মাদক বিক্রিও করে। যেহেতু সে সাংবাদিক দাবি করে, তাকে তো কেউ ধরবে না, বিভিন্ন সময় এভাবে সে মাদক লেনদেন করে। পরে আমি চিন্তা করলাম, যদি মাদক লেনদেন করে থাকে, আমি যদি ওরে বলি কিছু ইয়াবা লাগবে অবশ্যই দেবে।’
ওসির দাবি, পরে আমি যখন একাধিক ফোন করে তাকে না আনতে পারি, আমাদের যে পুলিশি কৌশল আছে সে অনুযায়ী তখন আমার মনে হলো যে আমি ওর কাছে কিছু ইয়াবা চাই। চাইলে সে হয়তো দেব।, তখন আমি একপর্যায়ে তাকে আমি বলি যে, তুমি আমারে ৫০ পিস ইয়াবা দেবে। সে বলতেছে, যেহেতু ইলিয়াসকে ধরেছেন অন্য ব্যবসায়ীরা আমাকে বিশ্বাস করতেছে না। আমি বলি, সেটা আমি জানি না, তোমার কাছে আছে তুমি যেভাবে পার আমাকে দেবে। তারপরও সে দেয় না। এরপরে আমি ফোন দিয়ে বলি, তুমি যদি ভয় পাও, তুমি আমার থানার গেইটে রেখে যাও।’
তিনি জানান, ‘আমার চিন্তা-ভাবনা ছিল, সে আসবে। যার দরুন দুই পাশে আমার অফিসার ফোর্স রেখে দেই, ও এসে যখন এখান থেকে যাবে তখনই ওকে ধরবে। এরকম একটা পলিসি আমি গঠন করি, সেই পলিসিকে কেন্দ্র করে এই সুযোগটা সে নিয়ে আমার নামে একটা অহেতুক মিথ্যা বানোয়াট কথা ছাপাইতেছে। আমার সঙ্গে যে কথা হয়েছে, সেগুলো কেটে কেটে যেটুকুতে আমার ফল্ট পাওয়া যায়, সেটুকু সে ফেসবুক পেইজে আপলোড দিয়েছে। সে আদৌ কোনো পত্রিকার সাংবাদিক কি না, আমার জানা নেই ‘
ওসি রোকেয়া বলেন, আমার যে মানহানি করা হচ্ছে এর বিচার আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম। আমার একটাই চাওয়া, শরণখোলার মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং মাদকমুক্ত করা। কারণ আমার শৈশব এই শরণখোলায় কেটেছে, আমি শৈশবে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত এই শরণখোলার বগি স্কুলে লেখাপড়া করেছি। যার দরুন আল্লাহ আমাকে সুযোগ দিয়েছে এখানে আসার। সেই সুযোগে আমি চাচ্ছিলাম যে, এইখানে মাদকমুক্ত করব।’
তিনি আরও বলেন, আমি বলতে পারব, জীবনে যখন এইখানে আসছি আসার সুযোগ দিয়েছে আমি মাদকমুক্ত করে ছাড়বো। কিন্তু তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই যে মাদক ব্যবসায়ীকে ধরার জন্য যে ফাঁদ পেতেছি, তার অংশ কেটে কেটে ফেসবুকে দিল, সে যে সাংবাদিক, কোন পত্রিকার সাংবাদিক আমার জানা নেই। আমার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা রটনা রটাইতেছে তাকে ধরার জন্য এই ফাঁদ পাতা আমি এটার বিচার আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম। আপনাদের যদি মনে হয় আমি আপনাদের জন্য মঙ্গলজনক, তাহলে আপনারা এর বিচার করেন এবং মঙ্গলজনক মনে না হলে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’
এর আগে গত রোববার (২ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার শীর্ষ মাদক কারবারি ইলিয়াস তালুকদারকে গ্রেফতার করা হয়। এদিন রায়েন্দা বাজারের ওয়াপদা কলোনি এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওসি রোকেয়া খানমের নেতৃত্বে ইলিয়াসের আস্তানায় আকস্মিক অভিযান চালায় পুলিশ।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ইলিয়াস বাউন্ডারি টপকে পাশের নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করেন। তবে কড়া নজরদারির কারণে শেষ পর্যন্ত নদী থেকেই তাকে আটক করা হয়।
এসময় তার কাছ থেকে ১৮ পিস ইয়াবা, ২০০ গ্রাম গাঁজা এবং নগদ ২৯ হাজার ৫৭৫ টাকা জব্দ করা হয়।
পরে সন্ধ্যায় ইলিয়াসের বসতঘরে তল্লাশি চালিয়ে চাইনিজ কুড়াল ও চাপাতিসহ বেশ কিছু দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এসময় সোহাগ নামে তার এক সহযোগীকে আটক করা হয়।
শীর্ষ মাদক কারবারি ইলিয়াসকে গ্রেফতারের পর ওসি রোকেয়ার বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তোলেন পুলিশের কথিত সোর্স মঠেরপাড় এলাকার বাসিন্দা ও কলেজছাত্র মো. শফিকুল ইসলাম।
সোমবার (৩ আগস্ট) বাগেরহাটের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানান তিনি।
মুসা দাবি করেন, ওসি তাকে ইয়াবা পাঠাতে বলেছেন, না হয় তাকে মিথ্যা মাদক মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তার বিপরীতে ব্যাখ্যা দিলেন ওসি রোকেয়াও। ফলে শীর্ষ মাদক কারবারি ইলিয়াসের গ্রেফতারের খবরের চেয়ে এখন ওসি ও কথিত সোর্সকে ঘিরে বিতর্কই এখন পুরো উপজেলার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
